হারিয়ে যাওয়া শিশুর কান্না


গল্প:

গ্রামের রাতগুলো সাধারণত শান্ত, নিস্তব্ধ। চারপাশে শুধু পুকুরের মাছের ছলছল শব্দ, দূর থেকে শোনা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কিন্তু সেদিনের রাতটা ছিল অন্যরকম। মাঝরাতে, যখন সবাই গভীর নিদ্রায়, হঠাৎ করেই শোনা গেল এক শিশুর করুণ কান্না। সেই কান্নার আওয়াজ ভেদ করে অন্ধকার রাতে ছড়িয়ে পড়ল, যেন কোনো নির্দোষ প্রাণী তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।



গ্রামের সবচেয়ে সাহসী ছেলে বিলু, সেই আওয়াজ শুনে চমকে উঠল। গ্রামের কুঁড়েঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। আওয়াজটি আসছে গ্রামের প্রান্ত থেকে, যেখানে পুরনো ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলো রয়েছে। বিলুর মনের ভিতর অজানা এক ভয় এসে বাসা বাঁধল, তবে তার সাহস তাকে পিছু হটতে দিল না। সে মনে মনে ঠিক করল, যে করেই হোক, সেই শিশুটির কাছে পৌঁছাতে হবে।

ধীরে ধীরে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে বিলু হাঁটতে শুরু করল। পায়ের নীচে শুকনো পাতার মচমচে শব্দ আর চারপাশের নিস্তব্ধতা তাকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলল। যখন সে কান্নার উৎসের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন দেখতে পেল একটি ছোট্ট মেয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে কাঁদছে। মেয়েটির হাতে ধরা ছিল একটি পুরনো খেলনা, যার বয়স যেন বহু বছর।

বিলু কাছে গিয়ে আস্তে করে মেয়েটির কাঁধে হাত রাখল। মেয়েটি চমকে উঠে তাকাল। তার চোখে ছিল ভয় আর অসহায়ত্বের ছাপ। বিলু মমতায় ভরা কণ্ঠে বলল, "ভয় পেও না, আমি তোমার সাথে আছি। তুমি কোথা থেকে এসেছ, তোমার নাম কী?"

কিন্তু মেয়েটি কিছু বলতে পারল না। তার কাঁপা কাঁপা ঠোঁট দিয়ে শুধু একটি শব্দ বের হল, "মা..."। বিলু বুঝতে পারল, এই মেয়েটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু কে এই মেয়ে? কোথা থেকে এসেছে? তার বাবা-মা কোথায়?

বিলু মেয়েটিকে তার কুঁড়েঘরে নিয়ে গেল। গ্রামের সবাইকে খবর দিল সে। সবাই জড়ো হল, কিন্তু কেউই মেয়েটিকে চিনতে পারল না। মেয়েটির পরিচয় নিয়ে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারল না। গ্রামের এক বৃদ্ধা বললেন, "আমি এই মেয়েটিকে আগে কখনো দেখিনি। ও কীভাবে এখানে এল?"

বিলু মেয়েটিকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরল, আশা করল কেউ না কেউ তার পরিচয় জানবে। কিন্তু কোথাও কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। দিন চলে গেল, রাত এল, কিন্তু মেয়েটির মনের ভিতর ভয় তবুও কাটল 

না। তার কান্না থামল না।

একদিন, বিলু ঠিক করল, সে মেয়েটির পরিচয় খুঁজে বের করবে। সে মেয়েটিকে নিয়ে শহরে গেল, যেখানে বড় বড় বাড়ি, গাড়ি, আর মানুষের ভিড়। সে পুলিশের কাছে খবর দিল, কিন্তু সেখানেও কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। মেয়েটির পরিচয় নিয়ে রহস্য আরও গভীর হল।

এর মধ্যে মেয়েটির সাথে বিলুর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। মেয়েটি ধীরে ধীরে বিলুর প্রতি ভরসা করতে শুরু করল। বিলু তার জন্য নতুন কাপড়, খেলনা নিয়ে এল। মেয়েটি ছোট ছোট হাসি দিয়ে বিলুকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত। বিলু বুঝতে পারল, মেয়েটি তাকে তার বড় ভাইয়ের মতোই ভালোবাসছে।

কিন্তু বিলুর মন এখনো শান্তি পাচ্ছিল না। সে জানত, এই মেয়েটির কোনো না কোনো পরিবার আছে, যাদের কাছে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

একদিন, বিলু সিদ্ধান্ত নিল যে সে মেয়েটির সাথে শেষবারের মতো সেই পুরনো ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে যাবে। হয়তো কোনো সূত্র খুঁজে পাবে যা তাকে মেয়েটির পরিবারের কাছে নিয়ে যেতে পারে। সেই বাড়িতে পৌঁছানোর পর, বিলু দেখতে পেল একটি পুরনো ছবি মাটির নিচ থেকে অর্ধেক বেরিয়ে এসেছে। ছবিটি তুলল বিলু। এতে দেখা যাচ্ছে এক পরিবার—এক মা, বাবা, আর ছোট্ট মেয়ে। বিলু অবাক হয়ে গেল, ছবির মেয়েটি তার সাথে থাকা মেয়েটির মতোই দেখতে।

বিলু বুঝতে পারল, এই বাড়িটাই মেয়েটির পুরনো বাড়ি। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল, কেন মেয়েটি এখানে ছিল, তার বাবা-মা কোথায় গেল?

এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী এসে বললেন, "এই বাড়ির মালিকরা কয়েক বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। তাদের মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল সেই সময়। কেউ জানে না, সে বেঁচে আছে কিনা।"

বিলুর মনে হলো, সেই মেয়েটিই তার সাথে আছে। সে বুঝল, এই মেয়ে তার পরিবারকে হারিয়ে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে ফিরে এসেছে, যেখানে তার মনে ছিল তাদের স্মৃতি।

বিলু মেয়েটির হাত ধরে বলল, "তুমি একা নও, তোমার নতুন পরিবার আমি।" মেয়েটির চোখে জল জমল, কিন্তু এবার তা ছিল আনন্দের জল। সে জানত, সে আর একা নেই, আর হারিয়ে যায়নি।

Comments